দেখন বালার আলপনা ছড়িয়ে পড়ে সবখানে

সাখাওয়াত হোসেন, রাজশাহী থেকে :

টিকইল যাওয়ার রাস্তা বেশ আঁকাবাকা। অনেকটা আলপনার মতো। আলপনার শুরুটাও কিন্তু ছোট্ট এই গ্রামে। এখানকার গৃহবধূ দেখন বালা প্রথম আলপনা আঁকা শুরু করেন। তার দেখানো আলপনা অল্প সময়ের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে। এখন তা সারাদেশের সবখানে। পহেলা বৈশাখের উৎসব এখন আলপনা ছাড়া কল্পনায় করা যায় না।

টিকইল গ্রামটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নে। এ গ্রামের প্রায় সব মানুষই হিন্দু ধর্মাবলাম্বী। তাদের আলপনার একটা অন্য রকম সম্পর্ক আছে। তারা সারাবছর আলপনা আঁকেন। প্রতিটা বাড়ির দেয়ালেই আঁকা থাকে আলপনা। ফুটে ওঠে পাখি, মাছ, লতাপাতা। প্রতিটা বাড়িই যেন এক একটা রঙিন ছবি।

রাজশাহী শহর থেকে রেলপথে টিকইল গ্রামের দূরত্ব দুই ঘণ্টার। তবে মাত্র ১২ টাকার টিকেটেই যাওয়া যায় নাচোলের আমনুরা। সেখান থেকে চার কিলোমিটার ভ্যানে যাওয়ার পরেই টিকইল গ্রাম। গত শুক্রবার সকালে গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটা বাড়িতেই আলপনা আঁকা। সারাবছর এখানে আলপনা থাকলেও নববর্ষকে ঘিরে সেগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আরও সুন্দরভাবে। গ্রামের অনেকে তখনও ব্যস্ত আলপনা আঁকতে।

আলপনার শুরুর গল্পটা শোনালেন ৬০ বছরের দেখন বালা নিজেই। বললেন, তখন তো আমার বয়স ১২ কি ১৩। বিয়ে হয়ে কেবল এ গ্রামে এসেছি। অল্প বয়স হওয়ায় রঙ নিয়ে আঁকতে ভালো লাগতো। বাড়িটাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলার জন্যই আঁকা শুরু। তখন দেয়ালে রংধনু আঁকতাম। আস্তে আস্তে বিভিন্ন ধরনের গাছ, লতাপাতা, ফুল, ছবি আঁকা শুরু করি। গ্রামের লোকেরা তা দেখতে আসত। মেয়েরা আঁকার কৌশল শিখে যেত। তারপর এই আলপনা পুরো গ্রাম, গ্রাম থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

দেখন বালা জানান, শুরুর দিকে রঙ বানানো হতো মাটি দিয়ে। বরেন্দ্রের লাল মাটি ধুয়ে আখির বের করে তৈরি করা হতো লাল রঙ। আর সাদা রঙ খড়ি মাটি অথবা চকের গুড়ো দিয়ে তৈরি করা হতো। সাদা মাটি পানির পাত্রে রাখলে পানির ওপর চর পড়তো। সেই চরকেই সাদা রঙ হিসাবে আলপনায় ব্যবহার করা হতো। এছাড়াও পানিতে চাল ভিজিয়ে পাটায় পিষে দেয়ালে দিলে সাদা রঙ হতো। তবে এই রঙ বেশিদিন থাকত না। তাই পরবর্তীতে আলপনা আঁকতে তারা বাজারের রঙ ব্যবহার শুরু করেন।
গ্রামের বাসিন্দারা জানান, বৃৃষ্টিতে আলপনা মুছে গেলেও তারা হাল ছাড়েন না। বারবার আঁকেন। ঘরবাড়ি সাজিয়ে রাখেন আলপনার রঙে। আলপনা এখন তাদের কাছে শুধু একটা ঐতিহ্য নয়, এটা জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পূজা, নববর্ষ কিংবা একুশে ফেব্রæয়ারিতে তারা বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে আরও ভালভাবে আলপনা আঁকেন।

গ্রামের বাসিন্দা রঞ্জনা বর্মন বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখছি, আমাদের দাদিমা, কাকিমারা আলপনা আঁকেছেন। পাড়া প্রতিবেশী সবাই আঁকতো। তা দেখে দেখে আমরাও শিখে নিয়েছি। বিশেষ করে দেখন দিদির কাছেই সবাই শিখেছে। রণজিৎ বর্মন বলেন, যে কোন উৎসবে আলপনা আঁকার জন্য এখন আমাদের ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে আমাদের বাড়িতে আলপনা আঁকতে কোনো উৎসব লাগে না।

তবে বরাবরের মতো এবারও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে দাশু বর্মণের স্ত্রী দেখন বর্মণ ও তার তিন মেয়ের হাতে আঁকা আল্পনা গোটা এলাকায় তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে দাশু বর্মণের বাড়িটি এলাকায় ‘নঁকশাওয়ালা বাড়ি’ খেতাব কুড়িয়েছে। বাড়ির বড় মেয়ে অনিকা বর্মণ জানান, প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক মানুষ তাদের গ্রাম দেখতে আসেন। তার মা এ আলপনার শুরু করায় তাদের বাড়িতে ভিড়টা বেশি। অসংখ্য মানুষের ভিড়ে তারা ক্লান্ত। দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে, নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। কোনো কোনো দিন তারা রান্না-খাওয়ারও সময় পান না।

নেজামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, টিকইলের দৃষ্টিনন্দন বাড়িগুলো দেখতে প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গা থেকে লোক আসে। তারা দেখন বালার দেখোনো আলপনা দেখে যায়। কিন্তু দেখন বালার এ প্রতিভার কোনো স্বীকৃতি নেই। এখন পর্যন্ত তার নাম কোথাও আসেনি। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ অলপনার  স্বীকৃতি দেখন বালার নামে ঘেষণা করার জন্য আমরা দাবি জানাই।

জানতে চাইলে নাচোল উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবিহা সুলতানা বলেন, টিকইল গ্রামের নারীরা সুন্দরভাবে তাদের বাড়িগুলোকে আলপনা দিয়ে সাজিয়ে রাখেন। ফলে সহজেই গ্রামটা আলাদা করা যায়। এ গ্রাম থেকে আলপনার শুরু বলে তিনিও জানেন। তবে তাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। সরকারের নির্দেশনা পেলে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে। এরপর তাদের স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে।

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *