মাটির তৈরি পণ্যে ঐতিহ্যের ছোঁয়া

সাখাওয়াত হোসেন

 

দিন দিন মাটির তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা কমছে। তবে রাজশাহীর বাবু সরকারের হাতে তৈরি মাটির জিনিসপত্রের চাহিদা একটুও কমেনি। কারণ, বাবু সরকার তার পণ্যের গায়ে ফুটিয়ে তোলেন পুরনো দিনের দেশীয় ঐতিহ্য। নান্দনিক এসব পণ্যের সবটাই নিয়ে যায় হস্ত ও কারুশিল্পের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘আড়ং’।

বাবু সরকার রাজশাহী মহানগরীর সাগরপাড়া শিবালয় মন্দিরের তত্বাবধায়ক। মন্দিরের ভেতরেই দুটি ঘর করে পরিবার নিয়ে থাকেন তিনি। সেখানেই তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে মাটির নানা শো-পিস তৈরি করছেন। চাহিদা বাড়ায় স¤প্রতি নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় আলাদা আরেকটি কারখানা চালু করেছেন তিনি।

সাগরপাড়ায় বাবু সরকারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি ঘরে থরে থরে সাজানো মাটির আয়নার ফ্রেম। অনেক ফ্রেমে আয়নার কাঁচও লাগানো হয়েছে। রয়েছে নানা ধরনের শো-পিস, প্রদীপদানি, আগরদানি ও শিশুদের খেলনা। এছাড়া দৃষ্টিনন্দনভাবে তৈরি করে রাখা হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধের ছোট ছোট মূর্তি। সবকিছুতেই রয়েছে পুরনো দিনের টোরাকাটা নানান নকশা।

৪৬ বছর বয়সের বাবু সরকার জানান, প্রায় ৩০০ ধরনের মাটির শো-পিস ও খেলনাসহ ব্যবহার্য জিনিসপত্র তিনি তৈরি করতে পারেন। এসব তৈরি করতে প্রথমে কাদামাটি একটি ডাইসে ভরতে হয়। এতে মাটির কাদা নির্দিষ্ট শো-পিসের অবয়ব পায়। বাকি কাজগুলো করতে হয় হাতে। তিনি সর্বনি¤œ ৩৫ টাকায় একটি প্রদীপদানি বিক্রি করেন। গৌতম বুদ্ধের মূর্তি বিক্রি করেন সর্বোচ্চ ৮০০ টাকায়। প্রায় ৩০ বছর ধরেই তিনি এসব তৈরি করেন। আড়ং তার কাছ থেকে পণ্য নিয়ে যায় ২০ বছর ধরে। আড়ংয়ের চাহিদা মেটাতেই তিনি হিমশিম খান। অন্য কোথাও পণ্য দিতে পারেন না।

প্রতিটি পণ্য পুরনো দিনের টেরাকাটা দিয়ে নকশা প্রসঙ্গে বাবু বলেন, পুরনো সবকিছুর একটা ঐতিহ্য আছে। সেগুলো এখনও মানুষ পছন্দ করেন। এই ভাবনা থেকেই তিনি পুরনো টোরাকাটা দিয়ে মাটির পণ্যের নকশা করেন। আর এ কারণেই তার পণ্যের চাহিদা খুব বেশি। প্রতি মাসে তিনি প্রায় ৭০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেন। মৃৎশিল্পী হিসেবে তার এখানে কাজ করেন এমন কর্মচারীদের বেতনসহ আনুষাঙ্গিক সব খরচ বাদ দিলেও তার আয় হয় ৪০ হাজার টাকা।

তবে কারুকাজ জানেন এমন মৃৎশিল্পীর সংকটে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জানিয়ে বাবু বলেন, আগে শুধু সাগরপাড়ায় তার বাড়িতে মাটির জিনিসপত্র তৈরি করা হতো। কিন্তু এ এলাকায় এখন দ¶ মৃৎশিল্পীর সংকট দেখা দিয়েছে। তাই উৎপাদন বাধাগ্রস্থ হচ্ছিল। অথচ পণ্যের চাহিদা বেড়েঝে। তাই নগরীর নওদাপাড়া এলাকায় একটা কারখানা খোলা হয়েছে। সেখানে চারজন মৃৎশিল্পী কাজ করেন। আর সাগরপাড়ায় শুধু বাবু সরকার আর তার স্ত্রী মলি সরকার কাজ করেন।

মলি সরকার বলেন, তার স্বামী প্রতিমাও তৈরি করেন। কিন্তু প্রতিমা তৈরির কাজ সব সময় থাকে না। তাই দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে গৃহসজ্জার নানা জিনিসপত্র তৈরিতেই তারা সারাবছর কাটান। বর্তমানে মৃৎশিল্পের দুর্দিন শুরু হলেও তাদের ওপর কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং তারা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না জনবল সংকটে। দ¶ অন্য মৃৎশিল্পীরাও এসব পণ্য তৈরি শুরু করলে তাদের জীবনেও নতুন দিন আসবে বলে মনে করেন মলি সরকার।

 

 

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আজকের দিন-তারিখ

  • শুক্রবার ( দুপুর ২:২২ )
  • ১৮ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং
  • ১৯শে সফর, ১৪৪১ হিজরী
  • ৩রা কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ( হেমন্তকাল )